avertisements
Text

প্রফেসর ড. মোঃ তোজাম্মেল হোসেন

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও জিয়াউর রহমান

প্রকাশ: ০২:৫৬ এএম, ২৩ নভেম্বর,মঙ্গলবার,২০২১ | আপডেট: ০৯:৪০ এএম, ১২ আগস্ট,শুক্রবার,২০২২

Text

প্রচলিত আধুনিক শিক্ষার সাথে ইসলামী শিক্ষার সমন্বয়ের  লক্ষ্যে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল দীর্ঘকালের। অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন, অনেক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে আবার অনেক সরকারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনা আর স্বপ্ন দেখার অবসান ঘটিয়ে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার মধ্যবর্তী শান্তিডাঙ্গা দুলালপুরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। 

এ সময় তিনি বলেছিলেন : “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সারা মুসলিম জাহানের নেতৃত্ব দেবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিা প্রাচ্যের দেশসমূহের মধ্যে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রয়াস। সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে ইসলামী ভাবধারার পরিচয় ঘটিয়ে সকল মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করে ন্যায়-নিষ্ঠ, নীতিবান, সুনাগরিক গড়ে তুলবে এ বিশ্ববিদ্যালয়- ”(দৈনিক ইত্তেফাক, ২৩ নভেম্বর,১৯৭৯)। যা দীর্ঘ ৪২ বছর নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর ষড়যন্ত্র পাড়ি দিয়ে আজ ৪৩তম প্রতিষ্ঠা দিবসে দেশের আদর্শ উচ্চ শিক্ষার অন্যতম পাদপিঠে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এর বিভাগ সংখ্যা ৩৪টি, ফ্যাকাল্টি ৮টি, ছাত্র-ছাত্রী ১৫৩৮৪ জন, বিদেশি শিক্ষার্থী ৩৮ জন, শিক্ষক সংখ্যা ৩৯৪ জন, আবাসিক হল-ছেলেদের ৫টি, মেয়েদের ৩টি, ইনস্টিটিউট ১টি, ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজ ১টি, সাড়ে বারোশ আসন বিশিষ্ট কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম সম্বলিত ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (TSCC) ১টি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সবকিছু মিলিয়ে এক নয়নাভিরাম ক্যাম্পাস গড়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত কাঠামোগত উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলেছে । কিন্তু এই ব্যতিক্রমী বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল, তা আজ অনেকটা লক্ষ্যচ্যুত এবং প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে অবিরাম। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দেশের অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন আর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

১৭৫৭ সালে পলাশীর বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে । ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর নানা কারণে ভারতের মুসলমানদের শিক্ষাসহ যাবতীয় উন্নতি স্থবির হয়ে পড়ে । লাখেরাজ সম্পত্তি সরকারি হেফাজতে নিয়ে নেয়ার কারণে মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী লাখেরাজ সম্পত্তি নির্ভর মসজিদ ও মাদরাসা ভিত্তিক অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় । শিক্ষার মাধ্যম ও বিষয়সমূহ পরিবর্তন, মিশনারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মান্তরিত হওয়ার ভয় ইত্যাদি কারণে মুসলিম শিক্ষা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয় । এহেন বাস্তবতায় ১৭৮০ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ মাদরাসা স্থাপনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে বঞ্চিত মুসলিমগণ আবারো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক কলকাতা, মুম্বাই এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও তাতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। তাছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষা ও মুসলমানদের প্রতি অবহেলার কারণে এতদঞ্চলে মুসলমানদের উচ্চশিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উঠে। ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ’র নেতৃত্বে মুসলিম লীগ গঠনের পর ভারতীয় মুসলমানরা নতুন করে রাজনৈতিক দিকদর্শন লাভ করেন। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি তাদের চেতনার উন্মেষ ঘটে। এসময় ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় পূর্ববাংলা ও আসামের মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন। এ সম্মেলনে তৎকালীন মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য মাদরাসা শিক্ষার সাথে প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে ‘মাদরাসা রিফর্ম কমিটি' নামে’ একটি স্কিম গঠন করা হয়, যেখানে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব ছিল। ১৯১০ সালে আগস্ট মাসে প্রস্তাবিত এ স্কিম পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের নিকট পেশ করা হলে তা সক্রিয় বিবেচনাধীন থাকে। এদিকে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে এ অঞ্চলের মানুষের গণরোষ কিছুটা প্রশমিত করার মানসে ১৯১২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন এবং তাতে ইসলামিক স্টাডিজ নামে একটি ফ্যাকাল্টি রাখার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের তীব্র বিরোধিতা আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব ঘটে। অবশেষে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্বের প্রস্তাব অনুযায়ী ইসলামিক স্টাডিজ ফ্যাকাল্টি নামে স্বতন্ত্র ফ্যাকাল্টি না করে  কলা অনুষদের অধীনে ‘এরাবিক এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ’ নামে একটি বিভাগ খোলা হয়। বিভিন্ন কমিটির সুপারিশ ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পাকিস্তান আমলেও অব্যাহত থাকে। ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খান শিক্ষা সংস্কার কমিটি, ১৯৫৮ সালে এস. এম. শরিফ কমিশন ‘ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশকে জোর সমর্থন, ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এস. এম. হুসাইন ‘ইসলামিক এ্যারাবিক ইউনিভার্সিটি কমিশন’ কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ এক রিপোর্ট প্রদান, ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর আব্দুল মোনায়েম খান ছাত্র-জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বরিশালের কাসেমাবাদে এক সমাবেশে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। একই বছর সুনামগঞ্জে এবং ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিলেও এসব প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয়নি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্র এবং রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি উচ্চারিত হতে থাকে। বাংলার মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হন। এবং ১৯৭৪ সালে তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  গড়ে তোলেন । অতঃপর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির যৌক্তিকতা উপলব্ধি করে ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর সরকারিভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭৭ সালের ২৭ জানুয়ারি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এম. এ. বারীকে সভাপতি করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে ১৯৭৭ সালের ২০ অক্টোবর তাদের নিম্নবর্ণিত রিপোর্ট পেশ করে- 

১. কলা ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে ইসলামী শিক্ষার সমন্বয় সাধন করতে হবে, যাতে সমন্বিত কোর্স এক নতুন উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করে। 

২. যারা এ সমন্বিত কোর্সের মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনের সাথে সাথে কলা ও বিজ্ঞানের আধুনিক বিশেষ বিশেষ শাখায় যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে, তারা তাদের কর্ম জীবনের বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন হতে সক্ষম হবে এভাবে এ দেশের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশেষত যারা ইসলামী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত, তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে। 

৩. ইসলামী শিক্ষা ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা কর্মকান্ডে এ বিশ্ববিদ্যালয় একটি সম্পূর্ণ একক আবাসিক শিক্ষাদানকারী পাদপীঠ হিসেবে নিয়োজিত থাকবে। 

৪. এ বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী শিক্ষা তথা মাদরাসা শিক্ষার পুনর্গঠন, উন্নয়ন ও নতুন পরিবেশের সাথে পরিচয় ঘটাতে সহায়তা করবে। বিশ্ববিদ্যালয় যখন পুরোদমে চলবে তখন সেখানে কমিটির সুপারিশ অনুসারে মেডিসিন ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নির্বাচিত কিছু বিভাগ খোলা হবে, যুগের চাহিদার প্রয়োজনে ও বিশ্ববিদ্যালয় সামর্থ্য বিচার করে। কমিটি যেসব ইনস্টিটিউট -এর প্রস্তাব করে তা হলো :  ১. ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল রিসার্চ : এখানে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক এবং মাদরাসার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। ২. ব্যুরো অব ট্রান্সলেশন : এর উদ্দেশ্য হবে অনুবাদ, সংকলন, প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করা এবং কাক্সিক্ষত মানসম্পন্ন পাঠ্যবই প্রস্তুত করা। এ ইনস্টিটিউট-এর মাধ্যমে রেফারেন্স, লিটারেচার, বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল, গবেষণাসহ মূল্যবান বই-পুস্তকের অনুবাদ করার কাজ সম্পন্ন করা হবে। ৩. মধ্যপ্রাচ্য শিক্ষা ইনস্টিটিউট : এ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে মুসলিম দেশের ভাষা, অতীত ও বর্তমান অবস্থার ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ নীতি সম্পর্কিত শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কমিটি আরো প্রস্তাব করে যে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ল্যাবরেটরি স্কুল স্থাপিত হবে, যেখানে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার সুবন্দোবস্ত থাকবে।

এদিকে ১৯৭৬ সালের ৩১ মার্চ হতে এপ্রিল পর্যন্ত সৌদি আরবের মক্কায়  ও.আই.সি.-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানদের সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অংশগ্রহণ করেন। উক্ত সম্মেলনে ও.আই.সি.এবং মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের  অর্থানুকূল্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক মানের তিনটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশিষ্ট ইসলামী শিক্ষাবিদ ড.এ.এন.এম.মমতাজ উদ্দিন চৌধুরীকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিয়ে ঢাকায় একটি প্রকল্প অফিস স্থাপন করেন। অবশেষে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ জেলার মধ্যবর্তী শান্তিডাঙ্গা দুলালপরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেন। 

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশই  সর্বপ্রথম মুসলিম দেশ, যেখানে ও.আই.সি.সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রথম সফলভাবে কার্যকর করে। পরের বছর ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। অতঃপর প্রকল্প পরিচালক ড.এ.এন.এম. মমতাজ উদ্দিন চৌধুরীকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস- চ্যান্সেলর নিয়োগ দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০% নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই ১৯৮৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের এক আদেশ বলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে আকস্মিকভাবে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ থেকে ঢাকার অদূরে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে স্থানান্তর করা হয়। এখানে ৫০ একর জমির ওপর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পর ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে দু'টি অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগে মোট ৩০০ জন ছাত্র নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। অন্যদিকে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে গাজীপুরে স্থানান্তরের প্রতিবাদে অত্র অঞ্চলের আপামর জনসাধাষরণ তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলে । আন্দোলনের গতি ও প্রকৃতি উপলব্ধি করে তৎকালীন এরশাদ সরকারের আদেশে ১৯৮৯ সালের ২ জানুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় কুষ্টিয়াতে স্থানান্তর করা হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি না হওয়ায় কুষ্টিয়ায় বিকল্প ব্যবস্থায় আপাতত শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়। 

১৯৯০-এর গণ অভ্যুত্থানের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ১৯৯২ সালের ১ নভেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম মূল ক্যাম্পাসে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এভাবে জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় এক যুগ পরে খালেদা জিয়া সরকারের আমলে মূল ক্যাম্পাসে আসার সুযোগ পায়। মূল ক্যাম্পাসে ফেরার পর থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সকল ক্ষেত্রে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঈর্ষণীয় অবস্থান সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে একচেটিয়া অবস্থান করে নিয়েছে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে কোন অংশে পিছিয়ে নেই।  যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তা আজও অর্জিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পকেট ডায়েরিতে প্রতিষ্ঠাতার নাম দেয়ার বিষয়টি এড়ানোর জন্য ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রশাসন কর্তৃক ডায়েরি প্রকাশই বন্ধ ছিল। অতঃপর ২০১৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠা তার নাম বাদ দিয়ে পকেট ডায়েরি প্রকাশিত হচ্ছে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানসমূহেও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় না। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত  মুক্তচিন্তার উচ্চতর বিদ্যাপীঠের আচরণ হতে পারে না। এটি অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক ঘটনা। এ ধরনের সংকীর্ণ আচরণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত। ইতিহাস তার আপন গতিতে চলে, ক্ষমতা বা শক্তি প্রয়োগ করে সত্য ঘটনাকে কিছুদিন চাপা দিয়ে রাখা যেতে পারে; কিন্তু সঠিক ইতিহাস একদিন না একদিন রচিত হবেই।  একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য স্বাধীনতাত্তোর প্রথম প্রতিষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণায় জোর দিতে হবে। বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস সংযুক্ত করা এবং একাডেমিক সংযোগ বাড়াতে হবে। হলগুলোতে দলমত নির্বিশেষে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের সহাবস্থান সৃষ্টি করতে হবে। ক্যাম্পাসে  ভয়-ভিত্তিহীন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসটি পরিপূর্ণভাবে আবাসিক করতে হবে। এই হোক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাদিবসের স্লোগান।

 লেখক : সাবেক সভাপতি, শিক্ষক সমিতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
 

লেখকের আরও লেখা

avertisements
বাবাকে পিটিয়ে ৩১ লাখ টাকা ছিনতাই করে ছেলেরা!
বাবাকে পিটিয়ে ৩১ লাখ টাকা ছিনতাই করে ছেলেরা!
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ঢাকায়
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ঢাকায়
রাজধানীতে অনেক এলাকায় আজ তিন ঘণ্টা করে লোডশেডিং
রাজধানীতে অনেক এলাকায় আজ তিন ঘণ্টা করে লোডশেডিং
কলেজছাত্রকে বিয়ে করা সেই শিক্ষিকার লাশ উদ্ধার
কলেজছাত্রকে বিয়ে করা সেই শিক্ষিকার লাশ উদ্ধার
পিরোজপুরে ছাত্রদল নেতা সহ নাজিরপুরের ছাত্রনেতা ছাত্রলীগের হামলায় আহত
পিরোজপুরে ছাত্রদল নেতা সহ নাজিরপুরের ছাত্রনেতা ছাত্রলীগের হামলায় আহত
ছাত্রলীগের কর্মসূচি দেয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েট
ছাত্রলীগের কর্মসূচি দেয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েট
গঙ্গা চুক্তির সুফল পায়নি বাংলাদেশ : ফারাক্কা কমিটি
গঙ্গা চুক্তির সুফল পায়নি বাংলাদেশ : ফারাক্কা কমিটি
পানির দাম ১৫ শতাংশের বেশি বাড়াতে চায় ওয়াসা
পানির দাম ১৫ শতাংশের বেশি বাড়াতে চায় ওয়াসা
তেলাপোকামুক্ত ঘর সহজেই
তেলাপোকামুক্ত ঘর সহজেই
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা : প্রক্সি দিতে গিয়ে আটক ঢাবি শিক্ষার্থী
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা : প্রক্সি দিতে গিয়ে আটক ঢাবি শিক্ষার্থী
কেজিতে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে চালের দাম : ডিমের হালি হাফ সেঞ্চুরি
কেজিতে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে চালের দাম : ডিমের হালি হাফ সেঞ্চুরি
বিশ্ববাজারের সঙ্গে তেলের দাম সমন্বয় রাখা সম্ভব ছিল : বিশেষজ্ঞরা
বিশ্ববাজারের সঙ্গে তেলের দাম সমন্বয় রাখা সম্ভব ছিল : বিশেষজ্ঞরা
ইচ্ছে করলেই এই সরকারকে ফালাইয়া দেয়া যাবে : জাপা মহাসচিব
ইচ্ছে করলেই এই সরকারকে ফালাইয়া দেয়া যাবে : জাপা মহাসচিব
কমলগঞ্জে সন্ত্রাসীদের হামলায় সাংবাদিক বাছিত আহত
কমলগঞ্জে সন্ত্রাসীদের হামলায় সাংবাদিক বাছিত আহত
অভাবের তাড়নায় সন্তানকে বিক্রি করতে বাজারে তুললেন মা
অভাবের তাড়নায় সন্তানকে বিক্রি করতে বাজারে তুললেন মা
কর্ণেল আজিমের রোগমুক্তি কামনায় বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
কর্ণেল আজিমের রোগমুক্তি কামনায় বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
অরাজনৈতিক হয়েও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার ডা. জুবাইদা রহমান
অরাজনৈতিক হয়েও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার ডা. জুবাইদা রহমান
এ প্রতিহিংসার শেষ কোথায়!
এ প্রতিহিংসার শেষ কোথায়!
জার্মান বিএনপির সভাপতি আকুল মিয়ার মাতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ
জার্মান বিএনপির সভাপতি আকুল মিয়ার মাতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ
বিনিয়োগকারীদের ২৪ হাজার কোটি টাকা লাপাত্তা
বিনিয়োগকারীদের ২৪ হাজার কোটি টাকা লাপাত্তা
গুন্ডা-মাস্তান থেকে চেয়ারম্যান হয়েছি-শামিম (ভিডিওসহ)
গুন্ডা-মাস্তান থেকে চেয়ারম্যান হয়েছি-শামিম (ভিডিওসহ)
গুন্ডা-মাস্তান থেকে চেয়ারম্যান হয়েছি-শামিম (ভিডিওসহ)
গুন্ডা-মাস্তান থেকে চেয়ারম্যান হয়েছি-শামিম (ভিডিওসহ)
ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন নিয়োগ বিধিমালা নিয়ে অসন্তোষ
ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন নিয়োগ বিধিমালা নিয়ে অসন্তোষ
শিক্ষার টেকসই উন্নয়ন, প্রসার ও কর্মমুখীকরণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া ও বিএনপির ভূমিকা
শিক্ষার টেকসই উন্নয়ন, প্রসার ও কর্মমুখীকরণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া ও বিএনপির ভূমিকা
ধামরাইয়ে বাসা বাড়িতে দেহ ব্যাবসার অভিযোগ
ধামরাইয়ে বাসা বাড়িতে দেহ ব্যাবসার অভিযোগ
মোদি-বিরোধী প্রতিবাদে মৃত্যুর তদন্ত চেয়েছে ১১টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন
মোদি-বিরোধী প্রতিবাদে মৃত্যুর তদন্ত চেয়েছে ১১টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন
রাজনীতিকে আওয়ামীকরণ
রাজনীতিকে আওয়ামীকরণ
তারেক রহমান যাঁর প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ
তারেক রহমান যাঁর প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ
ধামরাই থানায় এক মাস ঘুরেও মামলা করতে পারেনি দলিল লেখক
ধামরাই থানায় এক মাস ঘুরেও মামলা করতে পারেনি দলিল লেখক
স্বাস্থ্য খাতে জিয়াউর রহমান ও বিএনপির অবদান
স্বাস্থ্য খাতে জিয়াউর রহমান ও বিএনপির অবদান
avertisements
avertisements